টানা তিনবার পরিকল্পনার পর অবশেষে ঘুরে এলাম দেশের একমাত্র জল প্রপাত নাফাখুম এবং লাইখ্যানঝিরি ঝর্না । বান্দরবানের দুই পাহেড়ে সবুজে ঘেড়া অলংকার ।ঈদের পরদিন ঢাকা থেকে আমারা ১১ জনের দল বান্দরবানের দিকে যাত্রা শুরু করি , আমাদের ভাগ্য সুপ্রশ্নন ছিল , কারন কোন রকম রাস্তার জ্যাম ছাড়াই আমারা ভোরে পৌছে যাই বান্দরবান ।আমাদের পরবর্তি গন্তব্য থানচি বাজার । বাসের ভিতরে সিট থাকলেও ফাকা নেই , তাই বাসের ছাদই ভরসা । বান্দরবান শহর থেকে পাহাড়ি আকা বাকা উচু নীচু পথ দিয়ে থানচি পযন্ত যেতে সময় লাগে ৪ ঘন্টা , এর মাঝে রাস্তা ভাঙ্গার কারণে বাস পরিবর্তন করা লাগে ২ বার ।থানচি পৌছতে আমাদের দুপুর হয়ে গেল ।সেখানে দুপুরের খাবার শেষে , নৌকা ভাড়া করে রওয়ানা হলাম আমরা রেমাক্রি বাজারের দিকে । আজকে রাত আমাদের সেখানেই থাকতে হবে ।দুই পাশে পাহাড়ের মাঝে দিয়ে বহমান সাঙ্গু নদীর অগভীর পানির উপর দিয়ে যাচ্ছে আমাদের নৌকা ,একজনও সাতার জানি না ,কিন্তু চারিদিকের নীল সবুজের অপুর্ব সৌন্দযে সেই ব্যাপারটা মাথায় ছিল না । কাচের মত পরিষ্কার পানির নিচের পাথরগুলো দেখা যাচ্ছিল , আমারা ঢাকাবাসী যারা বুড়িগঙ্গার পানি দেখে অভ্যস্ত তাদের কাছে সত্যি অনেক অবাক করা।পথের মাঝে আমাদের ৪ বার নৌকা থেকে নেমে হেটে পথ পার হতে হল । কারণ ঐ জায়গাগুলো ওজন নিয়ে নৌকা পার হতে পারে না । তিন্ডু বাজার পার হয়ে রেমাক্রি পৌছতে আমাদের প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেল ।কয়েকটা কুড়ে ঘর নিয়ে পাহাড়ের উপর এই রেমাক্রি বাজার । থাকার এবং খাওয়ার ব্যাবস্থা এইসব কুড়ে ঘরেই।পাহাড়ের উপরে রাতের এক অবাক করা জীবনধারা ,কারেন্ট নেই , আকাশের চাদটা যেন অনেক নীচে , সোলারের হাল্কা আলো ।আস্তে আস্তে রাতের আকাশ কুয়াশায় ঢেকে গেল ।
পরদিন সকাল ৮ টা দিকে আমরা নাফাখুমের দিকে রওয়ানা দিলাম । পাহাড়েরর উপরে হাল্কা কুয়াশার চাদর । অল্প শীত । পাহাড়ি পথ কখনো উপর দিকে উঠছে , আবার কখনো নামছে নীচের দিকে ।চারপাশে ঘন সবুজে ঘেরা মাঝখানে মেয়েদের চুলের চওড়া নীল ফিতার মত বহমান সাংঙ্গু নদী , এর পাশের ছোট বড় পাথরের পথ । পানির স্রোত আর হাল্কা পাখির ডাক , আর আমাদের পাথরের উপর ফেলা পদক্ষেপের মচ মচ শব্দ ছাড়া কোন আওয়াজ নেই । চলার পথ যেন ভিডিও গেমসের এক এক স্টেজ ।কখনো উচু , কখনো বা নিচু , কখনো বড় বড় পাথরের উপর দিয়ে , আবার কখনো ভাঙ্গা গাছের উপর দিয়ে , হাটু পানি পার হয়ে , আবার দুই পাশের অজানা গাছের মাঝের সরু অলিগলি পথ , কখনো একদম পাহাড়ের গা ঘেষা সরু পিচ্ছিলপথ। সত্যিকারভাবে মনে হচ্ছিল নিজেদের ইন্ডিয়ানা জোন্সের চরিত্রের মতো।এইভাবে প্রায় টানা সাড়ে তিন ঘন্টা পাহাড়ি পথ পার হবার পর যখন আমারা নাফাখুম জলপ্রপাতের সামনে চলে আসলাম ,নাফাখুম জল্প্রপাতের কাছে যাবার আগেই দূর থেকে তার পানির গর্জন কানে আসছিল আমাদের । নাফাখুম জল্প্রপাতের সামনে যাবার পর এই অপরুপ সৌন্দর্য্র বর্নণার ভাষা আমার জানা নেই।এতটা সময় ধরে পথ পাড়ি দেয়ার ক্লান্তি এক মুহুর্তে কেটে গেল ।এমন একটা জলপ্রপাত আমাদের দেশের রয়েছে !!!! প্রায় ৪০ ফুটের মত লম্বা এবং ৩০ ফুটের মত চওড়া (আমার চোখের হিসাব ) এর জল্প্রপাতে ইংরেজি U ভাবে বরফের কুচির মত পানি পরছে , নিচে পরে সরু পথ ধরে চলে গেছে বহু দূর , শিহরন জাগানো সেই সৌন্দর্য দেখে মন ভরে গেল, নয়ন জুরিয়ে গেল।নেমে গেলাম আমরা সেই জল্প্রপাতের পানিতে , প্রক্রিতির সৌন্দযের কাছে মাঝে মাঝে মানুষ শিশু হয়ে যায় । গোছল করতে যেয়ে কখন যে ২ ঘন্টা পার হয়ে গেছে আমাদের কোন খেয়াল ছিল না । যেতে ইচ্ছে করছিল না , মনে হইচ্ছিল এই জপ্রপাতের পাশেই থেকে যাই বাকি জীবন ।আবার আমরা ফেরা শুরু করলাম রেমাক্রি বাজারের দিকে । রেমাক্রি বাজারের পৌছতে আমাদের প্রায় বিকাল হয়ে গেল ।
পরদিন সকালে যাত্রা শুরু করলাম আমাদের নতুন লক্ষে লাইখ্যানঝিরি ঝর্নার দিকে । লাইখ্যানঝিরি যেতে প্রথমে নৌকায় সময় লাগে ৩০ মিনিট । এর পর শুরু হাটা পথ । পুরো পথই আমাদের হাটতে হবে ঝর্নার পানির উপর দিয়ে ,এই পথ সম্পর্কে আমাদের ধারণাই ছিল না , এই কারনে পিচ্ছিল পাথরে পরে যাবার আভিজ্ঞতা ১ বা ২ বার সবাইকেই নিতে হল , ঝর্নার পানির প্রবাহে বাশের লম্বা সারি ভাসিয়ে নিয়ে যেতে দেখে মনে হচ্ছিল যেন ঝর্না বাশের বড় মালা দিয়ে নিজেকে সাজিয়েছে ।এইদিকে কোন জনবশতি নেই, শুধুই সবুজে ঘেরা বন যেন প্রক্রিতির সাথে সবুজের মিতালি । পাহাড়ের গায়ে কিছু জায়গায় জুম চাষ হতে দেখলাম আমরা। দুর্গম এই জায়গায় বর্ষাকালে যাওয়াটা সম্ভব নয় , কারন পুরোটা পথ থাকে তখন পানির নিচে ।টানা প্রায় ২ ঘন্টা ৩০ মিনিট হাটার পর যখন লাইখ্যানঝিরি ঝর্নার সামনে গেলাম সত্যিকারভাবেই নিজেকে অনেক সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছিল , কারন পর পর ২ দিন বাংলাদেশের গহীন অরন্যের স্রষ্টার এমন ২টা সৌন্দর্য দেখতে পেলাম । প্রায় ১০০ ফুট উচু পাহাড়ের উপর থেকে পানির ধারা নিচে এসে ঝর্নার রুপ নিয়েছে , আর সেই পানির ধারা বয়ে চলে গেছে বহু দূর ।আর সেই ঝর্নার চারপাশে আছে ছোট বড় হাজারো পাথেরর টূকরা। ঝর্নার পানির প্রবাহ মাঝে মাঝে বাড়ছে আবার কমছে । প্রায় ১ ঘন্টা ঝর্নার পানিতে গোসল করলাম , ফিরার পথে আর একটা ছোট ঝর্না দেখলাম যা সেই মুল ঝর্নার অংশ ।লাইখ্যানঝিরি ঝর্না থেকে আমাদের রেমাক্রি বাজার ফিরতে সময় লাগলো প্রায় ৩ ঘন্টা । সেইদিনই আমারা থানচি বাজার চলে ফিরে এলাম ।শেষ করালাম আমাদের জল প্রপাত নাফাখুম এবং লাইখ্যানঝিরি ঝর্না অভিযান ।
আমাদের দেশের রাজনৈতিক আর সামাজিক অবস্থা যাই হোক না কেন , সৌন্দযের দিক থেকে সত্যি বলতে হয় , “সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি “।
কিভাবে যাবেন
দিন - ১
ঢাকা থেকে বান্দরবান (সরাসরি বাস সার্ভিস আছে )
বান্দরবান থেকে থানচি বাজার ( বাস ভাড়া ১২০+৭৫ টাকা ) এছাড়া সরাসরি চাদের গাড়িও ভাড়া করতে পারেন ।
থানচি বাজার থেকে রেমাক্রি বাজার ( নৌকা ভাড়া ৪৫০০-৫০০০)
রেমাক্রি বাজারে থাকার খরচ (জনপ্রতি ১০০-১২০)
দিন ২
রেমাক্রি বাজার থেকে নাফাখুম ( হাটা রাস্তা ৪+৪ = ৮ ঘন্টা )
নাফাখুম যেতে আলাদা গাইড নিতে হবে ।
দিন ৩
রেমাক্রি বাজার থেকে লাইখ্যানঝিরি ঝর্না ( নৌকা ১০০০-১৫০০ টাকা , ৩০ মিনিট)
হাটা রাস্তা ২.৩০+২.৩০ = ৫ গ ঘন্টা
লাইখ্যানঝিরি ঝর্না যেতে আলাদা গাইড নিতে হবে ।
|