সুমিত বণিক : একটু আনন্দঘন উপলক্ষ্য হলেই সেই উৎসবের খাবারের স্বাদ বা উৎসবের আনন্দকে শতভাগ উপভোগে হাতে ছোট-বড় সবার হাতেই পাওয়া যায় একটা এনার্জি ড্রিংক। খাওয়ার পর হয়ত একটু সাময়িক অনুভূতির পরিবর্তন হিসেবে নিজেকে একটু নিস্তেজ বা উত্তেজিত মনে হয়। এতেই অবাধে লুফে নিচ্ছে খেতে কাশির সিরাপের মতো, নেশায় ফেনসিডিল সিরাপের মতো-স্বাদে বর্তমানে তরুণ সমাজের কাছে বহুল পরিচিত শক্তিবর্ধক, ফলের রস মিশ্রিত, হার্বাল পানীয়র নামে বাজারজাতকৃত জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নেশা সৃষ্টিকারী ক্ষতিকর এসব পানীয়। ফ্যাশন আর আধুনিকতার সংজ্ঞা আমাদের মাঝে এমনই জাল পেতেছে যে আজকাল অনেক তরুণরাই বলাবলি করে, এসব একটু-আধটু না খেলে নাকি স্মার্ট হওয়া যায় না। যারা এসব পানীয় পানে অভ্যস্থ না তারাও বন্ধুদের অযৌক্তিক মনভোলানো কথায় বাধ্য হয়ে পড়ে প্ররোচিত হতে। অভিভাবক মহলেও নেই কোন সতর্কতা। অনেক অভিভাবকও এসবের ক্ষতিকারক দিকগুলো সম্পর্কে ন্যূনতম অবহিত নন। তারা অনেকেই মনে করে, আমার সন্তানটি ক্লান্তি দূর করতে এনার্জি ড্রিংক খাচ্ছে, এতে শংঙ্কিত হওয়ার কি আছে! কিন্তু তার সন্তানটি যে অসাধু ব্যবসায়ীদের গ্যাড়াকলে পড়ে এনার্জি ড্্িরংকের মাধ্যমে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে তা অভিভাবক বা সন্তান কেউ জানছে না। মাদক হিসেবে অন্তর্ভূক্তি না হওয়ার জন্য এসব বিপননে ব্যবসায়ীরাও নিচ্ছে আধুনিক ও অভিনব কৌশল। কিছু পানীয়র গায়ে ক্রেতার অধিক দৃষ্টি আকর্ষনের জন্য কার্যকারিতা হিসেবে দূর্বলতা, বিশেষ অঙ্গের শক্তিবর্ধক ও যৌন উত্তেজক লেখার পাশাপাশি সুকৌশল হিসেবে শুধুমাত্র প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য সর্তকবাণী হিসেবে লিখে অনেক ক্ষেত্রে অপ্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে এর আকর্ষণ আরও বাড়ানো হয়। রেড হর্স, হর্স ফিলিংস, রুচিতা ফিলিংস. ম্যান পাওয়ার সহ বিভিন্ন জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এসব পানীয়, অবাধে প্রকাশ্যে জেলার সর্বত্র পাওয়া যাচ্ছে। এসব পানীয়র গায়ে ঔষধের মতো কার্যকারিতা লেখা থাকে। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, এসবে খাদ্যদ্রব্য হিসেবে বিএসটিআই বা ঔষধ হিসেবে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কারোরই কোন অনুমোদন নেই। বেশীর ভাগ কোম্পানীর পানীয়ই সরকারী অনুমোন ও আইনের তোয়াক্কা না করে তরুণ সমাজের কাছে পানীয়র আড়ালে অবাধে এসব নেশাজাতীয় উপকরণ মিশ্রিত পানীয় বাজারজাত করে আসছে।
এসবের প্রতি অতিমাত্রায় চাহিদা বৃদ্ধির ফলে আশংকার বিষয় হলো, শক্তিবর্ধক ফল মিশ্রিত হার্বাল পানীয়র নামের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পানীয় তরুণ সমাজের পাশাপাশি ছোট শিশুরাও হাতের কাছে পাওয়া যায় বলে এর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে। প্রতিভাবান সংস্কৃতি শিল্পীদের মাধ্যমে শুধু শক্তিবর্ধক পানীয়র প্রচারণা শুরু হলেও, ঠিক এই সুযোগটির উপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। ফলে তাদের শক্তিবর্ধক শব্দটির পাশাপাশি ফলমিশ্রিত, হার্বাল, শব্দগুলোর আড়ালে খুব সহজেই নেশা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর উপকরণ মিশিয়ে এই পানীয়গুলো বিপনন করে যাচ্ছে।
অধিকাংশ এই পানীয় পানকারীদের বক্তব্য, এটি কোন ক্ষতি ছাড়াই শরীরকে উত্তেজিত করে, শরীরে শক্তি জোগায়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে এমন কিছু রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে, যা সাময়িকভাবে আমাদের কিছু সমস্যা সমাধান করে উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়, কিন্তু এর স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদী অনেক ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদানের কারণে এসব পানীয় পানে একবার অভ্যস্থ হয়ে পড়লে, সহজে বর্জন করা যায় না। এছাড়া বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই এই সব পানীয়তে ব্যবহৃত ক্ষতিকারক উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন রাসায়নিক উপাদান অনেকেরই সহ্য ক্ষমতার বাইরে। বিশেষ করে এটি হৃদযন্ত্রের কম্পন ও চাপের ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় প্রভাব ফেলতে পারে তাই এসব পানীয়র ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকা দরকার।
শক্তিবর্ধক এসব পানীয় গুলোতে বেশী পরিমাণে সুগার ও ক্যাফেইন থাকে, যা শক্তি জোগায়। পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে ইফিড্রিন, অপিয়েটস, গুয়ারানা, সিলডেনাফিল সাইট্্েরট ও জিংসেং এর মিশ্রণও পাওয়া যায়। চরম দারিদ্র্যের মাঝে থাকা দেশের সহজ-সরল মানুষগুলোকেও দেখা যায়, এসবের কার্যকারিতা হিসেবে লেখা বিষয়- মনের প্রফুল্লতা, প্রশান্তি, ক্ষুধামন্দা, শারিরীকি ক্লান্তি, অবসাদ, যৌন দূবলতা দূর্বলতা ইত্যাদি থেকে থেকে সাময়িক পরিত্রাণের জন্য সহজলভ্য এই পানীয়গুলো পান করে। কিন্তু একটি বিশেষ মহল নেশাসৃষ্টিকারী উপকরণের সাথে মিশিয়ে এর কার্যকারিতা বৃদ্ধির অপকৌশলের প্রচারণা বৃদ্ধির ফলে সম্প্রতি এসব পানীয়র প্রতি মানুষের চাহিদা অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পয়েছে। এই মুহূর্তে এসব পণ্যের বাজারজাতকরণ, বিপনন, উৎপাদন বন্ধ করা না গেলে হয়ত এই এনার্জি ড্রিংকই দেশের তরুণ সমাজে মাদকাসক্তির অন্যতম কারণ হয়ে উঠবে।
অভিজ্ঞ মহল মনে করেন, দেশে পণ্যের ভেজাল ও দামের কারচুপি ঠেকানোর নজরদারি ব্যবস্থা দূর্বল থাকার কারণে যে কারও পক্ষেই মানহীন পণ্য বিক্রি করে মুনাফা অর্জন সম্ভব হচ্ছে। সচেতন অভিভাবকদের দাবী, পানীয়র আড়ালে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নেশা দ্রব্যের উপকরণ মিশ্রিত এসব পানীয় বন্ধে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
|