যৌতুকের দাবি ও মেয়ে সন্তান জন্ম দেওয়ায়
শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনে হত্যার অভিযোগ
মাহ্মুদুল হক ফয়েজ
২২ এপ্রিল,2012 রবিবার রাত আনুমানিক ৮ টায় নোয়াখালী সদর উপজেলার মাইজদী কলেজপাড়ার সাব্বির আহম্মদের মেয়ে ফারজানা নূর সুখী (২৬)কে যৌতুকের দাবিতে ও একটি কন্যা সন্তান জন্ম দেওয়ার অপরাধে তার শ্বশুর বাড়ীর লোকজন নির্যাতন করে মেরে ফেলেছে বলে নিহত সুখীর আত্মীয় স্বজন অভিযোগ করেছে। সুখীর বাবা সাব্বির আহম্মদ বাদি হয়ে সুখীর শ্বশুর ডাঃআহ্সান উল্লা, শাশুড়ী মাহেরুন বেগম, স্বামী প্রভাষক বায়জিদ বোস্তামী ও ননদ বরকত জাহানকে আসামী করে বেগমগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করেছেন। মামলা নং-৪২ তাং ২৩।৪।২০১২। ধারা- নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০৩ এর ১১(ক)/৩০ তারিখ২৩।৪।২০১২ সময় ৫;০৫মিঃ। পুলিশ শাশুড়ী মাহেরুন বেগমকে গ্রেফতার করেছে। তাঁকে নোয়াখালী জেল হাজতে প্রেরন করা হয়েছে। অন্য আসামীরা পলাতক রয়েছে। আসামীদের পক্ষে জামিনের জন্য নোয়াখালী আদালতে আবেদন করলে মাননীয় আদালত তা নামঞ্জুর করেন।
সুখীর ভাই রেদোয়ান আহম্মদ সুজন
সুখীর ভাই রেদোয়ান আহম্মদ সুজন অভিযোগ করেন, সুখী একবছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামের ইতিহাসে প্রথম শ্রেণি নিয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষিকার পদে যোগদান করেন। এরপর বেগমগঞ্জ উপজেলার আলীপুর ইউনিয়নের ডা. আহসান উল্যার ছেলে ও বর্তমানে বরিশাল সরকারি হাতেম আলী কলেজের প্রভাষক বাইজিদ বোস্তামীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। সুজন জানান, বিয়ের পর থেকেই নানা ছলছুতায় বাইজিদ ও তার বাবা-মা সুখীকে শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার করতে থাকেন। এর মধ্যে তিনি গর্ভবর্তী হন। চাকুরি স্থল থেকে সুখী মাতৃজনিত ছুটি নিয়ে কিছুদিন আগে শশুরবাড়ী নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ থানার আলীপুরে চলে আসে।
১৪ এপ্রিল সুখী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে নোয়াখালী মডার্ন হসপিটালে ভর্তি করা হয় এবং সিজারের মাধ্যমে সুখী একটি মেয়ে সন্তানের জন্ম দেন। নিয়মানুযায়ী প্রসূতিকে পাঁচ-সাত দিন হাসপাতালে রাখার কথা। কিন্তু শ্বশুর আহছান উল্লা খান (বেগমগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা) মেয়ে সন্তান দেখে বাইজিদ ও তার বাবা-মা সিজারের ৩ দিনের মাথায় সুখীকে তাদের বাড়িতে নিয়ে যান এবং মেয়ে সন্তান জন্ম দেওয়ার অপরাধে অত্যাচার করতে থাকেন। এমনকী তাকে খেতে না দিয়ে নির্যাতন করা হয়। এতে করে সুখীর সিজার করা স্থানে ক্ষত দেখা দেয়। এরপর সুখীর শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে পড়লে রোববার রাত ৮টায় আবার তাকে মডার্ন হসপিটালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু এর কিছুক্ষণ পরেই তিনি মারা যান।
ফারজানার বড় ভাই রেদোয়ান আহমেদ বলেন, বিয়ের পর থেকেই শ্বশুরবাড়ির লোকজন যৌতুকের দাবিসহ কারণে-অকারণে সুখীর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতেন। শেষ পর্যন্ত তাঁদের নির্যাতনে ফারজানার মৃত্যুর বিষয়টি ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনেও ফুটে উঠেছে।
সুজন জানান, শশুরবাড়ীর লোকজন সুখীর সাথে সব সময় দুর্ব্যবহার করতো। এমনকি সুখীর সাথে দেখা করতে গেলেও তাদেরকে দেখা করতে দ্ব্যা হোতনা । সুজন আরো জানান, বিয়ের পর থেকে যৌতুকের জন্য সুখীকে সব সময় চাপ দিতো। এরি মধ্যে তারা যৌতুক হিসাবে ফ্রীজ টিভি দামী আসবাবপত্র সহ অনেক কিছু দিয়েছে, সর্বশেষ তারা গাড়ীর জন্য চাপ দিচ্ছিল। তিনি বোনের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
রেদোয়ান আহমেদ অভিযোগ করেন, ঘটনার পর থেকে, একাধিক মুঠোফোন থেকে ফোন করে ফারজানার শ্বশুরপক্ষের সঙ্গে বিষয়টি মিটমাটের জন্য তাঁকে চাপ দেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি তিনি তদন্তকারী কর্মকর্তাকে জানিয়েছেন বলেও জানান।
মডার্ন হসপিটালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. আনিকা তাসনিম
মডার্ন হসপিটালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. আনিকা তাসনিম জানান, সিজার করা হলে সাধারণত ৭ দিন পর সেলাই কাটা হয়। সুখীকে সিজার করার ৩ দিন পর হাসপাতাল থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এতে তার সিজারের সেলাইয়ের জায়গায় ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনে তার মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক এ এইচ এম মোছলেহ উদ্দিন
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক এ এইচ এম মোছলেহ উদ্দিন ময়না তদন্ত প্রতিবেদ দাখিলের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, নিহত ফারজানা নূরের লাশের ময়না তদন্তের জন্য আবাসিক চিকিৎক মাহবুব আলম মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত পাঁচ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড সুখীর শরিরের বিভিন্ন স্থান ছাড়াও লিভারে আঘাতজনিত কারণে সুখীর মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত হয়েছেন।
মেডিকেল বোর্ডের দেওয়া ওই প্রতিবেদন গত মঙ্গলবার জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয় থেকে পুলিশ সুপারের কাছে পাঠানো হয়। তিনি ময়না তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
নোয়াখালী পুলিশ সুপার (এসপি) হারুন-উর-রশিদ হাযারী
ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার কথা নিশ্চিত করে পুলিশ সুপার (এসপি) হারুন-উর-রশিদ হাযারী থানায় যথাযথ তদন্ত চলছে বলে জানান। তিনি বলেন, তদন্ত শেষ করে শিগগির আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হবে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. শাহীনুজ্জামান(এসআই)
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বেগমগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শাহীনুজ্জামান বলেন, মামলায় অভিযুক্ত চার আসামির মধ্যে শাশুড়ি মাইনুর বেগমগকে (৫০) গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ওই দিনই আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়। বাকি তিন আসামিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
মাহ্মুদুল হক ফয়েজ
|