জামাল হোসেন, বেনাপোল থেকে৷৷ সরকার ঘোষিত ন্যায্য মজুরী বাসত্মবায়নের দাবিতে দেশের সর্ববৃহত্ বেনাপোল স্থলবন্দরে হ্যান্ডলিং শ্রমিক ইউনিয়নের সদস্যরা আবারও রোববার সকাল থেকে লাগাতার কর্মবিরতি শুরম্ন করেছে৷ শ্রমিক কর্মবিরতির কারণে বন্দর থেকে সব ধরণের মালামাল খালাস প্রক্রিয়া বন্ধ রয়েছে৷ বন্দরের ট্রাক টার্মিনালে কয়েক হাজার পণ্য বোঝাই ভারতীয় ট্রাক আটকা পড়ে আছে পণ্য খালাসের অপেৰায়৷ কয়েকশ' পণ্য চালানের সরকারি শুল্ককরাদি পরিশোধ করেও খালাস নিতে পারছে না সিএন্ডএফ এজেন্টরা৷ বন্দরে সৃস্টি হয়েছে ভয়াবহ ট্রাকজটের৷ এর ফলে অচল হয়ে পড়েছে দেশের সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর বেনাপোল৷ বেনাপোল থেকে কলিকাতার দুরত্ব কম থাকায় বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি হয়ে থাকে৷ শ্রমিক কর্মবিরতির কারণে এসব কাঁচামাল সময়মত বন্দর থেকে খালাস করতে না পারায় অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে শুরম্ন করেছে৷
রোববার সকাল থেকে শ্রমিকরা বন্দরের প্রশাসনিক অফিসসহ বন্দর এলাকার বিৰোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে৷ বিুদ্ধ শ্রমিকরা এ সময় বন্দরের কার্গো হ্যান্ডলিং ঠিকাদার শার্শা উপজেলা যুবলীগের সভাপতি মোঃ ওহিদুজ্জামানের অফিসে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করে ও পথচারীসহ ৪ জন মারাত্মক ভাবে আহত হয়েছে৷ আহত হচ্ছেন, শার্শার চন্দনপুর গ্রামের নজরুল ইসলাম (২৫), ঝিকরগাছা উপজেলার কামকোলা গ্রামের গরু ব্যাবসায়ী রফিক (৩৪), তালিম (৩২) ও অজ্ঞাত এক ব্যক্তি৷ এদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক৷ স্থানীয়রা তাদের গুরুতর অবস্থায় উদ্ধার করে যশোরে হাসপাতালে পাঠিয়েছে৷ শ্রমিকরা হুকের আঘাতে এক পথচারীর চোখ ও মুখমন্ডল বিকৃত করে দেয়৷ এ সময় পুলিশ প্রশাসন ঘটনাস্থলে থাকলেও তারা নিষ্ক্রীয় ভুমিকা পালন করছিল৷ সবকিছিু মিলিয়ে বন্দরের সার্বিক পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারন করছে৷ সাধারন মানুষ আতঙ্কে বন্দর এলাকায় চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে৷ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে বন্দর এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ, আনসার ও বিজিবি সদস্যদের৷ বন্দর এলাকায় শ্রমিকদের মাঝে উত্তেজনা বিরাজ করছে৷ ঠিকাদার নিয়োগ নিয়ে মতাসীন দলের দ্বন্দ্বের কারণে বার বার দেশের সর্ববৃহত্ স্থলবন্দর বেনাপোলে শ্রমিক অসনত্মোষ বিরাজ করছে বলে বন্দর ব্যবহারকারীরা জানিয়েছে৷
বন্দর সংশিষ্ট সুত্রে জানা যায়, স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্জ শেখ আফিল উদ্দিন গত তিন মাস ধরে চলমান সমস্যা সমাধানে বন্দর কর্তৃপ, শ্রমিক, ঠিকাদার ও স্থানীয় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানকে সাথে নিয়ে একাধিক বার বৈঠক করেন৷ শ্রমিকদের সব দায়িত্ব এমপি নিজে নিয়ে বন্দরের ঠিকাদার প্রথা বাতিল করে টেন্ডার পরিচালনার দায়িত্বও নিজে নেন৷ কিন্তু এক মাস অতিবাহিত হলেও শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরী পরিশোধে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তিনি ব্যর্থ হন৷ আরো জানা যায়, বন্দরে টেন্ডার প্রক্রিয়ার সাথে নৌ-পরিবহন মন্ত্রীর হাত রয়েছে৷ তারাই বিষয়টি নিয়ে একের পর এক নাটক সৃষ্টি করছেন৷ প্রশাসন ও বন্দর কর্তর্ৃপকে বলছেন যে ভাবে হোক আন্দোলন বন্ধ করুন৷ আর শ্রমিকদের বলছেন তোমরা তোমাদের দাবি আদায়ে সংগ্রাম চালিয়ে যাও আমি তোমাদের সাথে আছি৷ মন্ত্রীর আশ্বাসের কারনেই শ্রমিকরা জোরালো সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে আর প্রশাসনও নীরব ভুমিকা পালন করছেন৷ ফলে ঘটছে একের পর এক অপ্রীতিকর ঘটনা৷ পণ্য খালাস বন্ধ থাকায় বিলম্বিত হচ্ছে সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আদায়৷
বেনাপোল স্থলবন্দর হ্যান্ডলিং শ্রমিক ইউনিয়ন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকার ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এক গেজেটের মাধ্যমে স্থলবন্দর ব্যবহারকারীদের (আমদানিকারক) নিকট হতে আদায়কৃত লেবার হ্যান্ডলিং চার্জ (টন প্রতি) শ্রমিকদের শতকরা ৬৫ ভাগ হারে মুজুরী প্রদানের আইন জারি করেন৷ সে হিসাবে বেনাপোল বন্দর কতর্ৃপৰ আমদানিকারকদের কাছ থেকে টন প্রতি পণ্য থেকে আদায় করেন ২৮ টাকা ১৬ পয়সা৷ সেৰেত্রে শ্রমিকদের প্রাপ্য ১৮টাকা ৩০ পয়সা৷ কিন্তুু মধ্যস্বত্বভোগী ঠিকাদাররা গত বছরে টেন্ডারের মাধ্যমে কাজ নেন ১৮ টাকা ৫৫ পয়সা দরে এবং শ্রমিকদের প্রদান করেন টন প্রতি মাত্র ১২ টাকা৷ শ্রমিক তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য কতর্ৃপৰকে বার বার জানানোর পরও তাদের দাবি মানা হয়নি৷ এর আগে কর্মবিরতির ঘোষনা দিলেও স্থানীয় নেতৃবৃন্দের আশ্বাসে তারা তা প্রত্যাহার করে নেয়৷ দাবি পূরণ না হলে শ্রমিকরা গত ১৫ ও ১৬ এপ্রিল কর্মবিরতি পালন করে৷ এ সময় নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খান এমপির আশ্বাসের পরিপ্রেৰিতে তারা কর্মবিরতি প্রত্যাহার করে নেন৷ গত ১ মে ঢাকায় নৌ-পরিবহন মন্ত্রীর সাথে শ্রমিকদের এক বৈঠকে জানানো হয় চলতি টেন্ডারে যে সব ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান অংশ নিবে তারা শ্রমিকদের সরকার ঘোষিত মুজুরী প্রদান করবে তাদের সেই হিসেবে টেন্ডারের মাধ্যমে বন্দরের কাজ দেয়া হবে৷ কিন্তুু শ্রমিকদের প্রাপ্য দাবি বঞ্চিত করে বন্দর কতর্ৃপ গত ২৯ এপ্রিল কম মূল্যে বন্দরের হ্যান্ডলিং কাজ করার জন্য ৪টি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেন৷ এর পর একই দাবিতে গত ১ জুন থেকে আবারও লাগাতার কর্মবিরতির ডাক দেয় শ্রমিকরা৷ একটানা ৫দিন কর্মবিরতির পর ৬ জুন স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব শেখ আফিল উদ্দিন এর সাথে নৌ-পরিবহন মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রীসহ সংশিস্নষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের সাথে এক ফলপ্রসু বৈঠক শেষে তিনি শ্রমিকদের সকল দাবি মেনে নেয়ায় ঘোষনা দিলে শ্রমিকরা কর্মবিরতি প্রত্যাহার করে কাজে যোগ দেন৷ পরে সংসদ সদস্য উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, সমপ্রতি বেনাপোল বন্দরে যে শ্রমিক ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়েছিল তা বাতিল করা হয়েছে৷ পুনরায় নতুন ঠিকাদার নিয়োগ না হওয়া পর্যনত্ম সরকার ঘোষিত ৬৫ শতাংশ শ্রমিকদের মুজুরি পরিশোধ করবে স্থলবন্দর কতর্ৃপ৷ কিন্তুু জুন মাস পার হয়ে গেলেও শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য মজুরি এখনো পায়নি৷ এ আদেশ বাতিলের বিরুদ্ধে ঠিকাদাররা উচ্চ আদালতে মামলা করলে আদালত ন্যায্য মজুরী প্রাপ্তি আদেশ ৬ মাসের জন্য স্থগিত করে দেন৷ এর ফলে পূর্বের নিয়োগ পাওয়া ঠিকাদারের লোকজন রোববার পুনরায় কাজ করার জন্য বন্দরে এলে স্থানীয় শ্রমিকরা আবারো কর্মবিরতির ঘোষনা দিয়ে বন্দরের সকল কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়৷ শ্রমিকরা বন্দর কর্তৃপকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে এবার আর স্থানীয় কারো প্রতিশ্রতি মানা হবে না৷ সবাই আমাদের সাথে প্রতারনা করেছেন৷ তাই এবার খাতা কলমে ন্যায্য মুজুরী বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত লাগাতার কর্মবিরতি চলতে থাকবে৷
বেনাপোল স্থলবন্দর হ্যান্ডলিং শ্রমিক ইউনিয়নের (৯২৫) সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম লাল জানান, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে বন্দর শ্রমিকরা আমদানি পণ্য খালাস করে সরকারের রাজস্ব প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করে আসছে৷ শ্রমিকরা বৈষম্যের শিকার হয়ে সরকার ঘোষিত ন্যায্য মজুরী বাসত্মবায়নের দাবিতে ইতোপূর্বে তিনদফা কর্মবিরতির ডাক দেয় হয়৷ সে সময় নৌ-পরিবহন মন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব শেখ আফিল উদ্দিনের আশ্বাসের পরিপ্রেেিত শ্রমিকরা সর্বশেষ গত ৬ জুন কর্মবিরতি প্রত্যাহার করে নেয়৷ কিন্তুু এক মাস চলে গেলেও শ্রমিকরা এখনও জুন মাসের ন্যায্য মজুরী না পাওয়ায় আবারো রোববার সকাল থেকে লাগাতার কর্মবিরতি ঘোষনা করা হয়েছে৷ তিনি আরও জানান, সরকার ঘোষিত ন্যায্য মজুরি প্রাপ্তি আদেশ উচ্চতর আদালত ৬ মাসের জন্য স্থগিত হওয়ায় ঐ ৪টি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের অনকুলে কার্যাদি দেওয়ায় বিুদ্ধ হয় উঠেছে শ্র্রমিকরা৷ শ্রমিকদের প্রাপ্য ১৮ টাকা ৩০ পয়সা৷ কিন্তু ঠিকাদাররা নিন্ম দরে টেন্ডার আহব্বান করে শ্রমিক সেক্টরকে ধ্বংসের পায়তারা করছে৷ বাংলাদেশ স্থলবন্দর কতর্ৃপরে চেয়ারম্যান ও টেন্ডারবাজদের দুনর্ীতির কারণে চলমান এ সমস্যার সমাধান হচ্ছে না৷
বন্দর শ্রমিক ঠিকাদারের দায়িত্বরত কর্মকর্তা যুবলীগ নেতা মোঃ ওহিদুজ্জামান জানান, বন্দর কতর্ৃপরে সাথে তাদের প্রতিটন ১৮ টাকা মূল্যে চুক্তি হয়েছে৷ ইতিপূর্বে শ্রমিকরা প্রতিটন ১২ টাকা মজুরি পেলেও আমরা শ্রমিকদের জন্য মজুরী প্রতিটন ১৪/১৫ টাকা প্রদানের আশ্বাস দিয়েছি৷ আদালতের রায়ে আমরা বন্দরের ঠিকাদার কাজ করবো৷ অনেক শ্রমিক এ আন্দোলনের সাথে নেই৷ একটি মহল নিজেদের স্বার্থে পিছনে থেকে কলকাঠি নাড়ছে বন্দরকে ধবংস করতে৷ শ্রমিকরা বন্দরে অন্য শ্রমিক দিয়ে কাজ না করার জন্য হুমকি দিচ্ছে বলে সে জানায়৷
বেনাপোল সিএন্ডএফ এজেন্ট এসোসিয়েশনের সহসভাপতি সিরাজুল ইসলাম সিরাজ জানান, বেনাপোল বন্দরের শ্রমিকদের সমস্যা সমাধান করা অত্যনত্ম জরুরী৷ বার বার শ্রমিক কর্মবিরতির কারণে বন্দর অচল হয়ে থাকছে৷ ভারতীয় ব্যবসায়ীরা এ কারণে এ পথে পণ্য রফতানিতে উত্সাহ হারিয়ে ফেলছে৷
বেনাপোল বন্দরের পরিচালক আবুল কালাম আযাদ জানান, শ্রমিক কর্মরিতির কারনে আমরা সকাল থেকে প্রশাসনিক ভবনের মধ্যে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছি৷ বন্দরের শ্রমিক ইউনিয়ন রেজিঃ নং ৯২৫ ও ৮৯১ নামে দুটি শ্রমিক সংগঠনের ডাকা কর্মবিরতির ফলে বেনাপোল স্থলবন্দর অচল হয়ে পড়েছে৷ বেনাপোল বন্দরে মালামাল লোড আনলোডসহ সব ধরনের পণ্য খালাস প্রক্রিয়া বন্ধ রয়েছে৷ #
|