আজ ২৮ জুলাই ২০১২ বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস। হেপাটাইটিস লিভারের অসুখ। 'বি' ও 'সি' হেপাটাইটিসের সংক্রমণ সবচেয়ে মারাত্মক। যার পরিণতি হতে পারে লিভার সিরোসিস থেকে ক্যান্সার পর্যন্ত। অথচ সতর্কতায় হেপাটাইটিস দূর করা সম্ভব। এবিষয়ে লিখেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের লিভার বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক, কোয়ালিশন ফর ইরাডিকশন অব ভাইরাল হেপাটাইটিস ফ্রম এশিয়া-প্যাসিফিকের সদস্য ডা. মামুন-আল-মাহতাব
১৯৬৫ সালে হিমোফেলিয়া রোগীদের রক্ত নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে মার্কিন প্রফেসর ডা. ব্রয়েলশ ব্লুমবার্গ একজন অস্ট্রেলিয় আদিবাসীর রক্তে হেপাটাইটিস 'বি' ভাইরাসের জীবাণু আবিষ্কার করেন। প্রফেসর ব্লুমবার্গই সর্বপ্রথম হেপাটাইটিস 'বি' ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর ভ্যাকসিন উদ্ভাবন করেন।
এই ভাইরাসটি বর্তমানে বিশ্বব্যাপী একটি মহামারি। বিশেষত এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এ রোগের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি।
হেপাটাইটিস 'বি' তথা ভাইরাসজনিত লিভার রোগ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে ২০১১ সাল থেকে ২৮ জুলাই বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস পালিত হচ্ছে।
বাংলাদেশে হেপাটাইটিস 'বি'
ক্রনিক হেপাটাইটিস 'বি' এশিয়া ও প্রশান্ত-মহাসাগরীয় আরো অনেক দেশের মতোই বাংলাদেশেও লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের প্রধান কারণ। দুর্ভাগ্যের বিষয়, হেপাটাইটিস 'বি' অনেকাংশেই নিরাময়যোগ্য একটি রোগ হলেও অ্যাডভান্সড লিভার সিরোসিস অথবা লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত রোগীরা প্রায়ই কোনো শারীরিক অসুবিধা অনুভব করেন না। ফলে সে সময় হেপাটাইটিস 'বি' ভাইরাস ইনফেকশনের চিকিৎসা করা সম্ভব হলেও রোগীকে আর সেভাবে সাহায্য করা সম্ভব হয় না।
কিভাবে ছড়ায়?
বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ৩৫ কোটি লোক হেপাটাইটিস 'বি' ভাইরাসে আক্রান্ত, যার মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় এক কোটি। রক্তের মাধ্যমে এ ভাইরাসটি ছড়ায়। রক্ত ছাড়াও মানুষের লালাতেও হেপাটাইটিস 'বি' ভাইরাস পাওয়া যায়। হেপাটাইটিস 'বি' আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির রক্তমাখা সুইয়ের খোঁচায় ভাইরাসটি সংক্রমণের আশঙ্কা ৩০ শতাংশ। আর হেপাটাইটিস 'বি' ভাইরাস আক্রান্ত মায়ের সন্তানের আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রায় ৯০ শতাংশ, তবে মায়ের দুধের মাধ্যমে হেপাটাইটিস 'বি' ভাইরাস ছড়ায় না।
হেপাটাইটিস 'বি'র লক্ষণ
হেপাটাইটিস 'বি' ভাইরাসে আক্রান্ত প্রায় ৭০ শতাংশ রোগীর জন্ডিসে আক্রান্ত হওয়ার কোনো ইতিহাস থাকে না। যাঁরা এ ভাইরাসে আক্রান্ত হন, তাঁদের লিভারে স্থায়ী ইনফেকশন দেখা দেয়। একে ক্রনিক হেপাটাইটিস 'বি' বলা হয়। এসব ব্যক্তিই HBsAg পজিটিভ হিসেবে পরিচিত। এ ধরনের রোগীর প্রায়ই কোনো লক্ষণ থাকে না। এরা কখনো কখনো পেটের ডান পাশে ওপরের দিকে ব্যথা, দুর্বলতা কিংবা ক্ষুধামন্দার কথা বলে থাকেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রক্ত পরীক্ষার সময় কিংবা রক্ত দিতে অথবা ভ্যাকসিন নিতে গিয়ে রোগীরা তাঁদের ইনফেকশনের কথা জানতে পারেন।
হেপাটাইটিস 'বি' প্রতিরোধের উপায়
ভ্যাকসিনেশন হেপাটাইটিস 'বি' প্রতিরোধে কার্যকর। হেপাটাইটিস 'বি' ভাইরাসে আক্রান্ত মায়ের সন্তান, হেপাটাইটিস 'বি' রোগীর স্বামী বা স্ত্রী, স্বাস্থ্যকর্মী এবং থেলাসেমিয়া ও অন্যান্য হেমোলাইটিক এনিমিয়ার রোগীদের জন্য হেপাটাইটিস 'বি'র ভ্যাকসিন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
হেপাটাইটিস 'বি'র চিকিৎসা
লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যান্সার হওয়ার আগে রোগটি ধরা গেলে রোগাক্রান্ত ব্যক্তির পূর্ণ নিরাময়ের সম্ভাবনা থাকে। বাংলাদেশেও এ ওষুধগুলো সহজলভ্য। এর মধ্যে আছে ইন্টারফেরন, ল্যামিভুডিন, এডিফোভির, এনটেকাভির, টেলবিভুডিন আর টেনোফোভির। দেশীয় একাধিক ওষুধ কম্পানি এগুলোর বেশির ভাগই এ দেশে তৈরি করছে।
হেপাটাইটিস 'সি'
লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের অন্যতম প্রধান কারণ এটি। পাশ্চাত্যে বেশির ভাগ লিভার ট্রান্সপ্লান্টেশনই করা হয়ে থাকে হেপাটাইটিস 'সি' ভাইরাসজনিত লিভার রোগের কারণে। অথচ ১৯৮৯ সালে হেপাটাইটিস 'সি' ভাইরাস আবিষ্কৃত হওয়ার আগ পর্যন্ত মানুষের এই ভাইরাস সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। আর এ কারণেই হেপাটাইটিস 'বি'র পাশাপাশি হেপাটাইটিস 'সি' সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টিও বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসের অন্যতম প্রতিপাদ্য।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী পৃথিবীতে হেপাটাইটিস সি ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা ১৭-২০ কোটি, যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩ শতাংশ। আর এই সংখ্যাটি বিশ্বের এইডস রোগীর চেয়ে প্রায় চার গুণ বেশি। বাংলাদেশে প্রায় ৪০ লাখ লোক এ ভাইরাসে আক্রান্ত। তবে পাশ্চাত্যে এবং বিশেষ করে ভূ-মধ্যসাগরীয় অঞ্চলে হেপাটাইটিস 'সি'র প্রাদুর্ভাব অনেক বেশি।
কিভাবে ছড়ায়?
হেপাটাইটিস 'সি' ভাইরাস মূলত ছড়ায় রক্তের মাধ্যমে। দূষিত সিরিঞ্জ ব্যবহারের মাধ্যমে, বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বে অনেকেই নিজেদের অজান্তে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন। তা ছাড়া একই শেভিং রেজর, ব্লেড কিংবা ক্ষুর ব্যহারের মাধ্যমেও ভাইরাসটি ছড়াতে পারে। তবে সহবাসের মাধ্যমে অথবা গর্ভস্থ শিশুর হেপাটাইটিস 'সি' ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা খুবই কম।
'সি' ভাইরাসজনিত লিভার রোগ
শরীরে একবার হেপাটাইটিস 'সি' ভাইরাস প্রবেশ করলে তা ৮৫ শতাংশ ক্ষেত্রে লিভারে স্থায়ী ইনফেকশন তৈরি করে, যা ক্রনিক হেপাটাইটিস 'সি' নামে পরিচিত। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে রোগের কোনো লক্ষণ থাকে না বললেই চলে। অথচ ১০-১৫ বছরে মধ্যে এদের প্রায় অর্ধেকই লিভার সিরোসিসের মতো মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হন, যাঁদের অনেকেরই পরে লিভার ক্যান্সার দেখা দেয়।
মহিলা এবং অল্প বয়স্কদের লিভার হেপাটাইটিস 'সি' তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতি করে থাকে। অন্যদিকে যাঁরা অ্যালকোহল সেবন করেন তাঁরা হেপাটাইটিস 'সি' ভাইরাসে আক্রান্ত হলে লিভারে মারাত্মক রোগ সৃষ্টির আশঙ্কা খুবই বেশি।
হেপাটাইটিস 'সি'র চিকিৎসা
হেপাটাইটিস 'সি' এর বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ভ্যাকসিন নেই। তবে চিকিৎসায় হেপাটাইটিস 'সি' ভাইরাস সংক্রমণ প্রায় ৭০-৯০ ভাগ ক্ষেত্রে নিরাময়যোগ্য। এ রোগের অন্যতম প্রধান ওষুধ পেগাইলেটেড ইন্টারফেরন উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও তৈরি হচ্ছে।
|